বুধবার   ২৩ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৭ ১৪২৬   ২৩ সফর ১৪৪১

১৫

রিফাত হত্যা মামলা : জবানবন্দিতে যা বলেছেন মিন্নি

নিউজ ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় সাক্ষী থেকে আসামি করা রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি আমাদের হাতে এসেছে। গত ১৯ জুলাই বরগুনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে জবানবন্দি দেন মিন্নি।

১০ পৃষ্ঠার এই প্রশ্নবিদ্ধ জবানবন্দিতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হওয়া রিফাত শরীফ এবং এসব ঘটনায় আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

তবে এই জবানবন্দি প্রত্যাহারের জন্য এরই মধ্যে আদালতে আবেদন করেছেন মিন্নি।

বর্তমানে জামিনে মুক্ত মিন্নির আইনজীবী বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারী আসলাম জানান, ‘নিয়মানুযায়ী মিন্নি’র ওই আবেদন আদালতে নথিভুক্ত হয়েছে। পুলিশি নির্যাতনের মুখে এবং তাকে ওই জবানবন্দি দিতে পুলিশ বাধ্য করেছে বলে আবেদনে বলেছেন মিন্নি।’

মিন্নি তার জবানবন্দিতে রিফাত শরীফের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ২০১৭ সালে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার প্রেম হয়। রিফাত তখন বামনা ডিগ্রি কলেজের ছাত্র। রিফাত ওই সময় তার যে ক’জন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তার মধ্যে নয়ন বন্ডও ছিল।

কলেজে যাওয়া-আসার পথে নয়ন বন্ড আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বিরক্ত করত। তাতে সাড়া না দেয়ায় সে আমার বাবা ও ছোট ভাইয়ের ক্ষতি করার ভয় দেখায়। বিষয়টি রিফাত শরীফকে জানাই। রিফাত শরীফকে আমি ভালোবাসলেও অন্য মেয়েদের সঙ্গে রিফাতের সম্পর্কের বিষয়টি টের পাই।

পরে রিফাতের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং আমি ধীরে ধীরে নয়ন বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ি।

মিন্নি বলেন, বরগুনা সরকারি কলেজে পড়ার সময় রিফাত ফরাজী, রিফাত হাওলাদার ও রাব্বি আকনের সঙ্গেও পরিচয় হয়। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়ন বন্ডের বাসায় আমার যাতায়াত ছিল।

নয়নের বাসায় আমাদের দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের কিছু ছবি ও ভিডিও নয়ন গোপনে ধারণ করে, যা আমি প্রথমে জানতাম না। নয়নের বাসায় আমি প্রায়ই যেতাম এবং আমাদের শারীরিক সম্পর্ক চলত।

নয়নের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে মিন্নি বলেন, ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর নয়নের বাসায় আমার সঙ্গে নয়নের বিয়ে হয়। পরে আমি আমার বাসায় গিয়ে নয়নকে ফোন করে বিয়ের কথা গোপন রাখতে বলি। তখন নয়ন বলে- ওইটা বালামে ওঠে নাই। বালামে না উঠলে বিয়ে হয় না। এরপরও আমি নয়নের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখি। নয়নের সঙ্গে বিয়ের কথা আমার পরিবারের কেউ জানে না।

মিন্নি বলেছেন, ‘এক পর্যায়ে জানতে পারি নয়ন মাদকসেবী, ছিনতাইকারী এবং তার নামে অনেক মামলা। পরে আমি রিফাত শরীফের দিকে ঝুঁকে পড়ি। গত ২৬ এপ্রিল পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। তবে নয়নের সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্কসহ যোগাযোগ সবই চলত। বিয়ের পর জানতে পারি রিফাত শরীফও মাদকসেবী। সে মাদকসহ পুলিশের কাছে ধরা খেয়েছে। পরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমি রিফাতসহ আমার বাবার বাসায় থাকতাম। মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যেতাম। নয়নকে নিয়ে রিফাতের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি হতো এবং রিফাত শরীফ আমার গায়ে হাত তুলত। গত ২৪ এপ্রিল নয়ন আমাকে ফোন দিয়ে বলে, তোর স্বামী, হেলালের ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে। আমি রিফাতকে হেলালের ফোন ফেরত দিতে বললে রিফাত শরীফ আমাকে চড়-থাপ্পড় এবং তলপেটে লাথি মারে। রাতে মোবাইল ফোনে নয়নকে সব জানাই এবং কান্না করি। পরদিন আমি কলেজে গিয়ে নয়নের বাসায় যাই। রিফাত শরীফকে একটা শিক্ষা দেয়ার কথা বলি। পরে আমি বাসায় চলে আসি। পরে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মোবাইলে আমার কয়েক দফা কথা হয়। রিফাত শরীফকে মাইর দিয়া শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করি।

২৬ এপ্রিল আমি কলেজে যাই এবং রিফাত ফরাজীর পাশে বসি এবং রিফাত ফরাজীকে বলি, খালি হাতে কেন, জবাবে রিফাত হাওলাদার বলে, ওকে মারার জন্য খালি হাতই যথেষ্ট। এরপর রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসা করি, নয়ন বন্ড ও রিফাত শরীফ কলেজে এসেছে কিনা? এক পর্যায়ে নয়ন নতুন ভবনের পাশের দেয়াল টপকে ভেতরে আসে। আমি হেঁটে নতুন ভবনের দিকে যাই এবং নয়নের সঙ্গে রিফাত শরীফকে মারধরের বিষয়ে কথা বলি। এরপর রিফাত শরীফ কলেজের ভেতরে আসে এবং আমাকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য কলেজ থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলের কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু আমি মোটরসাইকেলে না উঠে সময়ক্ষেপণ করার জন্য পুনরায় কলেজ গেটে ফিরে আসি। রিফাত শরীফ আমার পেছন পেছন ফিরে আসে। তখন রিশান ফরাজী কিছু পোলাপানসহ আসে এবং রিশান ফরাজী জিজ্ঞাসা করে, তুমি আমার বাবা-মাকে গালি দিয়েছ কেন? রিফাত শরীফ বলে, আমি গালি দেই নাই। ওই সময় রিফাত ফরাজী জামার কলার ধরে এবং রিশান ফরাজী রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে। তারা রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একটি দা দিয়ে নয়ন বন্ড ও ১টি দা দিয়ে রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছিল। ওই অবস্থায় আমি নয়ন বন্ডকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করি। রিফাত শরীফ রক্তাক্ত অবস্থায় পূর্ব দিকে হেঁটে যায় এবং আমি রাস্তায় পড়ে থাকা জুতা পরি এবং উপস্থিত একজন আমার হাতে ব্যাগ তুলে দিলে আমি রিকশা করে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। এরপর আমার বাবাকে ফোন করি। আমার বাবা ও চাচা হাসপাতালে আসে। পরে রিফাত শরীফকে বরিশাল পাঠানো হয়। আমি বাসায় চলে যাই। দুপুরের পর খবর পাই রিফাত শরীফ মারা গেছে।’

জবানবন্দির নানা দিক নিয়ে আলোচনাকালে অ্যাডভোকেট আসলাম বলেন, ‘এটি যে মিন্নির স্বেচ্ছায় দেয়া নয় তা জবানবন্দির নানা বিষয়েই ফুটে উঠেছে। তাছাড়া প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে এই জবানবন্দির অনেক গরমিল রয়েছে। কথিত জবানবন্দির বিষয়বস্তু আগেই তৈরি করা ছিল।’

বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির একাধিক আইনজীবী বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মিন্নি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করলেও তার তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। তবে মামলার শুনানিতে যদি প্রমাণ হয় যে জবানবন্দির তথ্য সঠিক নয় কেবল তখনই প্রত্যাহারের এই আবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তার আগে নয়।’

রাজবাড়ী প্রতিদিন
রাজবাড়ী প্রতিদিন
এই বিভাগের আরো খবর